কুমিল্লা প্রতিনিধি, মোঃ রমিজ উদ্দিন :
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কাপাশকান্দি গ্রামে এক চিহ্নিত চোরকে ধরিয়ে দেওয়ার জেরে সাইফুল ইসলাম মুন্সি ও আলাউদ্দিন মুন্সিসহ তিনজনকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা, ঘরবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর এবং স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ প্রায় ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার মালামাল লুটপাটের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার ১ ও ৩ নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে তিতাস থানা পুলিশ।
তিতাস থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মমিরুল হকের নির্দেশনায় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে পুরান ঢাকার মিডফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেট সংলগ্ন কাপাশকান্দি গ্রামের শিরু মিয়ার ছেলে মো. ইব্রাহীমের বাসা থেকে মামলার ১ নম্বর আসামি কাপাশকান্দি গ্রামের ডিপটি মোল্লার ছেলে মো. অপু মোল্লা (৩০) এবং ৩ নম্বর আসামি একই গ্রামের মৃত আক্কেল আলীর ছেলে আলমগীর হোসেনকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তিতাস থানার এসআই নিজাম উদ্দিনসহ সঙ্গীয় ফোর্স।
গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামিকে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
জানা যায়, গত ৫ জুন শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার কড়িকান্দি (সদর) ইউনিয়নের কাপাশকান্দি গ্রামের অরুণ মুন্সির বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর আহত সাইফুল ইসলাম মুন্সি ও আলাউদ্দিন মুন্সির ছোট ভাই ইকরাম হোসাইন মুন্সি ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৭-৮ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে তিতাস থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী পরিবার ও দায়েরকৃত এজাহার সূত্রে জানা যায়, কাপাশকান্দি গ্রামের মৃত রেনু মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন ওরফে আবুলেছ (৩৩) দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি বড় ধরনের চুরির অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করে আসছিলেন।
সম্প্রতি স্থানীয় একটি মসজিদের ইমামের টাকা চুরির ঘটনায় তাকে আটক করে গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেন সাইফুল ইসলাম মুন্সি ও আলাউদ্দিন মুন্সি। পরে স্থানীয় সুধীজন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় তাকে পুলিশের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, জামিনে মুক্ত হয়ে আবুল হোসেন ওরফে আবুলেছ তার সহযোগীদের নিয়ে প্রতিশোধমূলক হামলার পরিকল্পনা করেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, এলাকায় সক্রিয় একটি চোরচক্র এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কিশোরের সংঘবদ্ধ গ্রুপও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন সাইফুল ইসলাম মুন্সি, আলাউদ্দিন মুন্সি ও অরুণ মিয়া মুন্সি। আহতদের মধ্যে সাইফুল ইসলামের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে প্রথমে তিতাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। বর্তমানে তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অপর আহত আলাউদ্দিন মুন্সি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং অরুণ মিয়া মুন্সি স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন।
মামলায় আসামি করা হয়েছে কাপাশকান্দি গ্রামের ডিপটি মোল্লার ছেলে মো. অপু মোল্লা (৩০), মো. কবির মুন্সির ছেলে মো. ফরহাদ মিয়া (২৫), মৃত আক্কেল আলীর ছেলে আলমগীর হোসেন (৩৫), মৃত আবদুল খালেকের ছেলে মো. সামছুল হক (৫০), তার সহোদর ভাই মো. আব্দুস ছাত্তার (৪৫), মো. নুরুজ্জামানের ছেলে সামির হোসেন (২৩), মৃত রেনু মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন ওরফে আবুলেছ (৩৩), তার সহোদর ভাই জহির মিয়া (৪৫), মো. মফিজ উদ্দিন (৩৬) এবং মাওলানা মিয়ার ছেলে মো. ছালাম মিয়া (৪০)-কে। এছাড়া আরও ৭-৮ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ জুন সন্ধ্যায় অভিযুক্তরা লাঠিসোটা, লোহার রড, পাইপ, রামদা, চাপাতি ও চাইনিজ কুড়ালসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সংঘবদ্ধভাবে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। এতে বাধা দিলে সাইফুল ইসলাম মুন্সির ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তার ভাই আলাউদ্দিন মুন্সি ও বাবা অরুণ মিয়া মুন্সিকেও মারধর করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, অপু মোল্লা, ফরহাদ মিয়া, আলমগীর হোসেন, সামছুল হক, আব্দুস ছাত্তার ও জহির মিয়াসহ অন্যান্য আসামিরা ধারালো অস্ত্র ও লোহার পাইপ দিয়ে হামলা চালিয়ে সাইফুল ইসলাম ও আলাউদ্দিন মুন্সিকে গুরুতর জখম করে। এতে সাইফুল ইসলামের মাথা, ভ্রুর ওপর, হাত ও পায়ে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। আলাউদ্দিন মুন্সির মাথা, হাত ও পায়েও গুরুতর আঘাত লাগে। এছাড়া অরুণ মিয়া মুন্সিকেও মারধর করে আহত করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার একপর্যায়ে আসামিরা বসতঘরের স্টিলের আলমারির তালা ভেঙে নগদ ৫ লাখ টাকা এবং পরিবারের পাঁচ ভাইয়ের স্ত্রীর প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণালংকার, যার আনুমানিক মূল্য ২৪ লাখ টাকা, লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি সাধন করা হয়।
পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য বলেন, “বর্তমানে আমাদের পাঁচটি পরিবারের প্রায় ৩০ জন সদস্য চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। অভিযুক্তরা অত্যন্ত ভয়ংকর প্রকৃতির হওয়ায় গ্রামের অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না। আজ চোরচক্রের বিরুদ্ধে কথা বলায় আমার দুই ভাই মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে এবং গ্রামের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে।”
এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আহতদের ছবি ও ঘটনার বিবরণ ভাইরাল হলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দেয়। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।