মোঃ তোসিকুল আলম বাবুল :
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত রক্ত দিয়ে লেখা এক পাণ্ডুলিপি। প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ পর্যন্ত, মানুষ যতটা না নির্মাণে মনোযোগী ছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি শক্তি ব্যয় করেছে বিনাশের আয়োজনে। গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডিস থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন—সবাই কমবেশি একটি সত্য স্বীকার করেছেন: শান্তি হলো কেবল দুটি যুদ্ধের মধ্যবর্তী এক সাময়িক বিরতি।
বিংশ শতাব্দীতে দুটি মহাযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যখন জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল, তখন ধারণা করা হয়েছিল যে পৃথিবী সম্ভবত সভ্যতর এক পথে পা বাড়িয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে সেই ধারণা এক বিশাল অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তি ও শিক্ষার স্বর্ণযুগ। অথচ বিদ্রূপের বিষয় হলো, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, যুদ্ধের মারণাস্ত্রগুলো তত বেশি নিখুঁত ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। আমরা যখন মঙ্গলে বসতি স্থাপনের নকশা করছি, ঠিক তখনই পৃথিবীর মাটিতে ড্রোন আর হাইপারসনিক মিসাইল দিয়ে একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করছি। শিক্ষার বিস্তার আমাদের বিবেককে কতটা শাণিত করেছে তা আজ বড় প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী মেধাবীরাই আজ গবেষণাগারে বসে মারণাস্ত্রের নকশা তৈরিতে ব্যস্ত। সভ্যতার এই ‘উন্নতি’ কেবল আমাদের ধ্বংস করার ক্ষমতাকেই বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা এক ধরণের ‘বৈজ্ঞানিক বর্বরতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
বর্তমানে পৃথিবীতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ ঘোষিত না হলেও, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আমরা একটি ছায়া যুদ্ধের (Proxy War) মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের ভূখণ্ডগত সংঘাত নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা শক্তি বনাম উদীয়মান রুশ জাতীয়তাবাদের এক দীর্ঘমেয়াদী সামরিক মহড়া। অন্যদিকে এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যকে (Hegemony) সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে তাইওয়ান প্রণালী—প্রতিটি স্থানেই রণতরীর আনাগোনা আর মহড়া উত্তেজনার পারদকে তুঙ্গে নিয়ে গেছে। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই কোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তির পাশে নতুন কোনো শক্তির উত্থান ঘটে, তখনই সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
আধুনিক সংঘাত এখন আর কেবল সীমান্তরেখায় বা পরিখায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি ঢুকে পড়েছে আমাদের ড্রয়িংরুমের ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনে। ‘সাইবার ওয়ারফেয়ার’ এখন যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। একটি দেশের পাওয়ার গ্রিড অচল করে দেওয়া, স্যাটেলাইট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা বা ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসিয়ে দেওয়া এখন বোমাবর্ষণের চেয়েও শক্তিশালী হাতিয়ার। এর পাশাপাশি চলছে ‘ট্রেড ওয়ার’ বা বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ। ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য বনাম বিকল্প মুদ্রার লড়াই বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এখন কেবল দাপ্তরিক চিঠি নয়, বরং একটি জাতিকে ভাতে মারার মারণাস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে ‘রুল-বেসড অর্ডার’ বা নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা এখন মুমূর্ষু। জাতিসংঘ এখন বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক দাবার চালে এক অসহায় দর্শক মাত্র। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার বারবার প্রমাণ করছে যে, আন্তর্জাতিক আইন বড় দেশগুলোর জন্য কেবল ইচ্ছাধীন বিষয়। যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আদালত বা জেনেভা কনভেনশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, তখন ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। বিশ্ব আজ অভিভাবকহীন এক অরাজকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বর্তমান অস্থিরতার নেপথ্যে কাজ করছে সম্পদের তীব্র নিয়ন্ত্রণ লিপ্সা। জীবাশ্ম জ্বালানি, বিরল খনিজ পদার্থ এবং অদূর ভবিষ্যতে সুপেয় পানির দখল নিয়ে শুরু হতে যাওয়া সংঘাত পৃথিবীকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করবে। একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্বাস্তু হওয়া কোটি কোটি মানুষের অভিবাসন সমস্যা অনেক উন্নত দেশে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের জন্ম দিচ্ছে। এই ঘৃণার রাজনীতি ও বিভাজন প্রকারান্তরে বিশ্বশান্তিকে আরও বেশি অসম্ভব করে তুলছে।
আমরা আজ আর কোনো ‘সম্ভাব্য’ যুদ্ধের তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ এক সামরিক বাস্তবতার দাবানলে পুড়ছে পৃথিবী।
ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার মধ্যকার ত্রিমুখী সংঘাত এখন আর কেবল প্রক্সি বা ছায়া যুদ্ধের আড়ালে ঢাকা নেই। এটি এখন এক উন্মুক্ত ধ্বংসযজ্ঞ। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। দুই দেশের হাজার হাজার সামরিক স্থাপনা, স্পর্শকাতর গবেষণা কেন্দ্র এবং কৌশলগত পরিকাঠামো আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় যেমন মুহুর্মুহু ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইলের পরীক্ষার মুখে, তেমনি ইরানের অভ্যন্তরে একের পর এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে।
সবচেয়ে শঙ্কার ও প্রমাদ গণনার বিষয় হলো, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—হরমুজ প্রণালী আজ প্রায় অবরুদ্ধ। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যার অভিঘাত লাগছে বিশ্বের প্রতিটি কোণায়। জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের কারণে পরিবহন খরচ বাড়ছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে উন্নত থেকে অনুন্নত—সব দেশেই মুদ্রাস্ফীতি আজ হাহাকারে পরিণত হচ্ছে, যা এক দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই সংকটে আমেরিকা এখন কেবল পর্দার আড়ালে থাকা শক্তি নয়; তারা লোহিত সাগর থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত সরাসরি সামরিক ফ্রন্টে অবতীর্ণ হয়েছে। মার্কিন রণতরী ও বিমানবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও সমুদ্রপথে যে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে, তা ইরান ও তার মিত্রদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ছে। একদিকে পশ্চিমের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও মারণাস্ত্র, অন্যদিকে প্রতিরোধের নতুন নতুন রণকৌশল—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আজ এক অন্তহীন রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং এটি আজ ‘পশ্চিম বনাম প্রাচ্যের’ এক বৃহত্তর মরণখেলায় রূপ নিয়েছে, যা বিশ্বশান্তির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়ার উপক্রম করছে।
আমরা এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে সামান্য একটি ভুল পদক্ষেপ বা একটি পারমাণবিক বোতামে ভুল স্পর্শ পুরো মানবসভ্যতাকে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিতে পারে। এই যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান দিচ্ছে না, বরং প্রতিদিন নতুন নতুন ট্র্যাজেডি আর লাশের পাহাড় জমা করছে। একবিংশ শতাব্দীর এই অস্থির সময়ে প্রয়োজন ছিল এমন এক বিশ্ব নেতৃত্বের, যারা অস্ত্রের ঝনঝনানি থামিয়ে সংলাপ ও সহনশীলতাকে গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু পেশীশক্তির দাপটে আজ বিবেক রুদ্ধ।
ইতিহাসের পাতায় হয়তো এই সময়টিকে ‘সভ্যতার চরম পরাজয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। যদি দ্রুত এই ধ্বংসযজ্ঞ না থামানো যায়, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো কোনো ইতিহাস পড়ার জন্য বেঁচে থাকবে না। কারণ, আধুনিক সভ্যতার এই আগুন যদি এখনই নেভানো না যায়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নয়, পুরো পৃথিবীকে ভস্মীভূত করে এক মহাশ্মশানে পরিণত করবে।
কবি ও লেখক:
মোঃ তোসিকুল আলম বাবুল।