আলী আহসান রবি :
ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০২৬:
আজ ৩রা এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দেশের জাতীয় দৈনিক ‘মানবজমিন’ পত্রিকার প্রথম পাতায় “দুই জাহাজই খেয়ে নিলো দশ মিলিয়ন ডলার” শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন ( বিএসসি) কতৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) কর্তৃক অর্জিত নতুন দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজের ক্রয়মূল্য, গুণমান এবং সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়ে যে তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস মাত্র। বিএসসি উক্ত সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
প্রকৃত সত্য এই যে:
১. প্রাতিষ্ঠানিক ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া:
• বিএসসির জাহাজ অর্জন বা ক্রয় প্রক্রিয়া কোনো একক ব্যক্তি বা বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর বর্তায় না।
• প্রতিটি ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পৃথক টেকনিক্যাল কমিটি, টেন্ডার কমিটি, প্রাক্কলন কমিটি এবং ক্লাস সার্ভেয়ারদের (Class Survey) সমন্বয়ে একাধিক ধাপ পার হতে হয়।
• পরবর্তীতে PDPP ও DPP প্রণয়ন, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট অন্য ১২টি মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির (Adviser Committee for Government Purchase) চূড়ান্ত অনুমোদন গ্রহণ করা হয়।
• বায়ার সুপারভাইজারসহ (Buyer Supervisor) বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও কমিটির চুলচেরা বিশ্লেষণের পর সরকারি ও থার্ড পার্টি সকল যাচাই-বাছাই ও ইন্সপেকশন শেষে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে এই জাহাজগুলো গ্রহণ করা হয়েছে।
• সুতরাং, প্রাতিষ্ঠানিক এই সম্মিলিত প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে কোনো ব্যক্তিবিশেষের চরিত্রহনন করা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর।
২. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া:
• জাহাজ দুটির সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে সরকারি ক্রয় বিধিমালা (PPR) এবং আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত ‘দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি’ (Tender Evaluation Committee)-র সুপারিশের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে।
• পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আইআইএফসি (IIFC) এবং যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত মেরিটাইম ল ফার্ম এইচএফডব্লিউ (HFW)-এর সক্রিয় আইনি ও কারিগরি পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছিল।
• আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত তিনটি প্রস্তাবের সবগুলোই ছিল ৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপরে, যা বিএসসির সংগৃহীত মূল্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।
৩. যৌক্তিক বাজারমূল্য ও সাশ্রয়ী ক্রয়:
• আন্তর্জাতিক ভ্যালুয়্যারদের (International Valuers) মাধ্যমে যাচাইকৃত এই জাহাজের প্রাক্কলিত মূল্য (Estimated Price) ছিল ৪০.২ মিলিয়ন ডলার।
• বিএসসি অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিটি জাহাজ ৩৮.৩৪ মিলিয়ন ডলারে ক্রয় করেছে, যা প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা কম এবং বাজারমূল্যের তুলনায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
• জাহাজের ১৩৫টি টেকনিক্যাল প্যারামিটার বিবেচনায় প্রতিবেদনে উল্লিখিত ৩২-৩৩ মিলিয়ন ডলারের তথ্যের কোনো দালিলিক ভিত্তি নেই।
৪. উন্নত প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের ইক্যুইপমেন্ট:
• জাহাজ দুটি আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন, NECA বিধিমালা অনুসরণ করে নির্মিত এবং গ্রিন হাউস গ্যাস (GHG) নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর।
• চায়নায় নির্মিত হলেও এর প্রধান যন্ত্রপাতিসমূহ (Major Equipment) ওয়েস্টার্ন এবং জাপানি অরিজিনের।
• এগুলো এরোডাইনামিক শেপ (Aerodynamic Shape) এবং ডুয়েল ফুয়েল রেট্রোফিট (Dual Fuel Retrofit) সম্পন্ন, যা বিএসসির অন্যান্য জাহাজের তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ উন্নত এবং ব্যাপক জ্বালানি সাশ্রয়ী।
৫. অসাধারণ পরিচালন ও আর্থিক সাফল্য:
• জাহাজ দুটি বহরে যুক্ত হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক রুটে সফলভাবে বাণিজ্যিক পরিচালনা করছে এবং USA, Brazil ও Ivory Coast সহ বিভিন্ন দেশের পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল (PSC) ও ক্লাসের (Class) প্রতিটি ইন্সপেকশনে ‘জিরো ডেফিসিয়েন্সি’ (Zero Deficiency) ডিক্লেয়ার করেছে, যা জাহাজদ্বয়ের উচ্চ গুণগত মান নির্দেশ করে।
• ইতিমধ্যে জাহাজ দুটি ৫০ কোটি টাকা আয় করেছে এবং বর্তমান পারফরম্যান্স অব্যাহত থাকলে আগামী ৬-৭ বছরের মধ্যেই বিনিয়োগকৃত সম্পূর্ণ অর্থ উঠে আসবে।
• বিএসসি গত অর্থবছরে ৮০০ কোটি টাকা আয় এবং ৩৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা সংস্থার ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাফল্য।
পরিশেষে, প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিএসসির বক্তব্যকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সারফেস ওয়েবের কিছু অসত্য তথ্য ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বিএসসি তার ৫৪ বছরের ইতিহাসে নিজস্ব অর্থায়নে ও সক্ষমতায় এই জাহাজদ্বয় অর্জনকে তার সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সাফল্য বলে বিবেচনা করে। এই ধরণের অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় অর্জনকে ভিত্তিহীন সংবাদের মাধ্যমে বির্তকিত করা জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের শামিল। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার স্বার্থে এবং বিএসসির প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরতে আমাদের এই প্রতিবাদলিপিটি যথাযথ গুরুত্বের সাথে প্রকাশের অনুরোধ জানাচ্ছে। বিএসসি তার সুনাম রক্ষার্থে প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।