মোঃ ফারুক আহাম্মেদ, স্টাফ রিপোর্টার:
কক্সবাজার নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে চলে আসে ঢেউয়ের গর্জন, বালিয়াড়ির সোনালি ঢাল এবং পর্যটকদের কোলাহলে মুখর।বছর ঘুরলেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন দেশের প্রধান পর্যটন নগরী এই কক্সবাজার।
এই বিশাল পর্যটন নগরীর আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে আছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ। সম্প্রতি তিনি বদলি হলেও পুনরায় কক্সবাজারেই পদায়ন করা হয়েছে, যা অনেকের মতে তার কর্মদক্ষতারই স্বীকৃতি।
ট্যুরিস্ট পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, ৩৪ জন ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার, ৬৮ জন ভাসমান অপরাধী আটক করা হয়। এ ছাড়া ২১৯ জন হারানো শিশু উদ্ধার, ৩৫টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, ১১ জন ইভটিজার গ্রেপ্তার ও ৪ জন মাদক ব্যবসায়ী আটক করা হয়। গত এক বছরে দায়ের হওয়া ১৮৩টি সিআর মামলার মধ্যে ১৭৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে বলেও জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
তবে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, পর্যটকদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার চেয়ে মামলা তদন্তেই বেশি মনোযোগী হচ্ছে পুলিশ। অনেক ক্ষেত্রে জামিনযোগ্য ধারায় মামলা হওয়ায় অভিযুক্তরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বালিয়াড়ি রক্ষায় জোরালো ভূমিকা রাখেন। নিজে উপস্থিত থেকে অভিযান চালিয়ে বহু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছেন।
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ট্যুরিস্ট পুলিশের দায়িত্ব একটাই, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পর্যটন এলাকায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা ঠেকানো।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের প্রসঙ্গে তার কণ্ঠ ছিল কঠোর – কক্সবাজারে কোনো অবৈধ দখলদার, কোনো চাঁদাবাজ বা সিন্ডিকেটের জন্য একচুল জায়গা নেই। তারা যতই শক্তিশালী হোক, আইন সবার জন্য সমান।
তিনি জানান, হোটেল-মোটেল, সৈকত এলাকা, পরিবহন ব্যবস্থা, ট্যুর গাইড ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম নিয়মের আওতায় আনা হচ্ছে। অবৈধভাবে দখল করা সৈকত ও পর্যটন স্পট উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
এক আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, আমরা একা কাজ করে যাচ্ছি, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা সবসময় পাচ্ছি না। বালিয়াড়ি থেকে লকার তুলে ফেলা হয়েছে, কিন্তু অদৃশ্য শক্তির বলে আবার তা বসানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ট্যুরিস্ট পুলিশ কেবল আইন প্রয়োগকারী বাহিনী নয়, বরং পর্যটকবান্ধব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে।
এদিকে, চালু হয়েছে হটলাইন, গঠন করা হয়েছে দ্রুত রেসপন্স টিম, মোবাইল পেট্রোল ইউনিট সক্রিয়,সদস্যদের জন্য আচরণগত ও ভাষাগত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্মার্ট পুলিশিং ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ট্যুরিস্ট পুলিশকে আন্তর্জাতিক মানের বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
কক্সবাজারের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কক্সবাজার হোটেল মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, আগে কিছু দুষ্টচক্র পর্যটকদের জিম্মি করে রাখত। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি আমাদের ব্যবসায়ে আস্থা ফিরিয়েছে।
সমুদ্র যেমন প্রতিদিন নতুন ঢেউ তোলে, তেমনি কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নতুন প্রত্যয়ের বার্তা দিচ্ছেন অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ। তার দৃঢ় উচ্চারণ, পর্যটন এলাকা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি দেশের সম্পদ। এখানে অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।