নিজস্ব প্রতিবেদক:
শোকজের জবাব না দিয়ে সময় চায় ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুল খালেক মিয়ার বেতন-ভাতা দীর্ঘদিন পরিশোধ না করার অভিযোগে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডকে শোকজ নোটিশ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। গত ৯ ডিসেম্বর পাঠানো ওই নোটিশে অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিয়ে কোম্পানিটি সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আইডিআরএ’র পরামর্শক (মিডিয়া ও যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নোটিশের জবাব যথাসময়ে না দিলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, “বীমা খাতে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইডিআরএ দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে।”
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের আগস্টে। অভিযোগ অনুযায়ী, ছুটিতে থাকা অবস্থায় গত ২০ আগস্ট-২০২৫ ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ স্বাক্ষরিত একটি পত্রের মাধ্যমে মো. আব্দুল খালেক মিয়াকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যা তিনি অবৈধ বলে দাবি করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ২৪ আগস্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে সিইও হিসেবে তাকে দেওয়া গাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, চাকরি অবসানের পত্র দেওয়ার মাত্র পাঁচ দিন পর—২৫ আগস্ট—আবারও একই ভাইস চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে তাকে ‘বাধ্যতামূলক ছুটি’তে পাঠানোর আরেকটি পত্র ইস্যু করা হয়।
একই দিনে কোম্পানির পক্ষ থেকে ‘কোম্পানির স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ থাকার অভিযোগ তুলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং ওই কমিটির বরাত দিয়ে মো. আব্দুল খালেক মিয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তবে তিনি যথাসময়ের মধ্যেই ওই নোটিশের জবাব দিলেও তার বাধ্যতামূলক ছুটি প্রত্যাহার করে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং বকেয়া বেতন-ভাতাও পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় আইডিআরএ’র কাছে লিখিত অভিযোগ করেন মো. আব্দুল খালেক মিয়া। তিনি জানান, চাকরি অবসান ও ছুটির সিদ্ধান্তের পর থেকে তাকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ১৭ আগস্ট কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ এবং কোম্পানি সেক্রেটারি ও হেড অব এইচআর (এডমিন) চৌধুরী এহসানুল হক তাকে পদত্যাগে চাপ দেন। এমনকি তাদের লোকজন তার বাসায় গিয়েও ইস্তফা দিতে চাপ প্রয়োগ করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে ২১ আগস্ট আইডিআরএ’র কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার আগে ২০ আগস্ট ই-মেইলের মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করেন মো. আব্দুল খালেক মিয়া। তার দাবি, “আমাকে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের অপকর্ম আড়াল করতেই ছুটিতে থাকা অবস্থায় আমাকে সকল কার্যক্রম থেকে বিরত রেখেছেন। আমি আশা করি আইডিআরএ ও প্রশাসন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমার অধিকার ফিরিয়ে দেবে—ইনশাআল্লাহ।”
আইন ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার দৃষ্টিতে এ ঘটনা বীমা খাতে একটি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একজন নিয়োগপ্রাপ্ত সিইও’র বেতন-ভাতা পরিশোধ না করা, একইসঙ্গে অব্যাহতি ও বাধ্যতামূলক ছুটির মতো পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে করপোরেট গভর্ন্যান্স ও শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ অমান্য করা শুধু প্রতিষ্ঠানটির জন্য নয়, পুরো বীমা খাতের আস্থার জন্য ক্ষতিকর।
এ বিষয়ে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান ও কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোম্পানির আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো অজানা।
ন্যায়ের প্রশ্নে আইডিআরএ’র ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো শোকজের জবাব না দিয়ে সময় বাড়ানোর আবেদন করা প্রতিষ্ঠানটির সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বীমা খাতে সুশাসন, কর্মীদের ন্যায্য অধিকার এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করতে আইডিআরএ কী সিদ্ধান্ত নেয়—সেদিকেই এখন তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ের ফলাফল বীমা খাতে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।