এম হোসাইন আহমদ, বিশেষ প্রতিবেদন :
দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বদেশে ফিরছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ২৫ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টা ১৫ মিনিট থেকে ১১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে তিনি রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা করছেন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ পৃথক বিবৃতিতে তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই সঙ্গে দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আনুষ্ঠানিকভাবে এই খবর প্রকাশ করা হয়। দলীয় সূত্রগুলোর মতে, এটি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান লন্ডন থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসবেন। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ফ্লাইটটি বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকায় অবতরণের কথা রয়েছে। আগমনকে ঘিরে বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা ও প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে আজ (বৃহস্পতিবার) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা। আমরা চাই এটি গত ৫৫ বছরের সব দৃষ্টান্তকে ছাড়িয়ে যাক। দেশের মানুষ বহুদিন ধরে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করছে। এই প্রত্যাবর্তন সেই প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করবে।”
বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমানের রাজনীতি মূলত জনগণকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। প্রবাসে থেকেও তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকি করেছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান বজায় রেখেছেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে—স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক সরকার, আইনের শাসন ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।
দলীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে তারেক রহমান আপাতত রাজনৈতিক কর্মসূচির চেয়ে পারিবারিক আবেগকেই প্রাধান্য দেবেন। বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন, যেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাঁর মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। মাকে দেখার পর ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসায় উঠবেন, যা খালেদা জিয়ার বর্তমান বাসভবন ‘ফিরোজা’র ঠিক পাশেই অবস্থিত।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক থেকেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএনপির পক্ষ থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামকে ‘প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি শান্ত ও সুশৃঙ্খল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এক নজরে ফিরে দেখা গেলে দেখা যায়, ২০০৭ সালের বিতর্কিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের সময় গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। ২০০৮ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য সপরিবারে যুক্তরাজ্যে যান তিনি। এরপর দীর্ঘ ১৮ বছর প্রবাসে অবস্থান করলেও ভার্চুয়ালি দলের নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি বড় মাইলফলক। বিএনপি মনে করছে, এই প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দল আরও সংগঠিত হবে এবং জনগণের কল্যাণভিত্তিক রাজনীতির পথে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে। দেশের মানুষও প্রত্যাশা করছে—এই প্রত্যাবর্তন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।