ফারজানা ফারাবী, ধর্মীয় ডেক্সঃ
পবিত্র কুরআনের অন্যতম সুপরিচিত ও গভীরতম নির্দেশনামূলক আয়াত হলো সূরা আন–নাহল-এর ৯০ নম্বর আয়াত। এই আয়াতটি এমন এক পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা, যেখানে মানবজীবনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার ভিত্তি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে জুমার খুতবায় প্রায় সবসময়ই এই আয়াত পাঠ করা হয়—কারণ এতে রয়েছে ইসলামি শিক্ষার সারাংশ ও মানবিক মূল্যবোধের পূর্ণতা।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আদেশ দেন ন্যায়পরায়ণতা, সৎকর্ম এবং আত্মীয়–স্বজনকে দান করার। আর তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসচ্চরিত্রতা ও সীমালঙ্ঘন থেকে। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যেন তোমরা স্মরণ রাখ।”
[সূরা আন–নাহল : ৯০]
ন্যায়পরায়ণতা : সমাজের ভারসাম্যের ভিত্তি
এই আয়াতের প্রথম নির্দেশ ‘আদল’ বা ন্যায়পরায়ণতা। ন্যায় হলো ইসলামের অন্যতম মূল চরিত্র। আদল বলতে শুধু বিচারব্যবস্থার ন্যায় বোঝানো হয়নি; বরং পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, সামাজিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রে সমতা ও সত্য প্রতিষ্ঠা করাকে বোঝানো হয়েছে।
ন্যায়পরায়ণতা এমন একটি মূল্যবোধ, যা মানুষকে তার আবেগ, লোভ বা রাগের বাইরে দাঁড়িয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়। রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে পরিবার পর্যন্ত, যেখানেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা না থাকে, সেখানেই অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। তাই আল্লাহর নির্দেশনার প্রথমেই ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা এসেছে—যা শান্তি ও সভ্যতার মূলভিত্তি।
ইহসান : নৈতিকতার উচ্চতম শিখর
দ্বিতীয় নির্দেশ ‘ইহসান’। ইহসান অর্থ—
সেরা ভাবে কাজ করা,
রহমত, দয়া ও মহত্ত্ব দেখানো,
মানুষকে তার প্রাপ্যের চেয়েও বেশি দেওয়া,
এবং আল্লাহকে দেখছেন এমন অনুভূতিতে জীবনযাপন করা।
ইহসানের প্রভাবে সমাজে আন্তরিকতা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিকতা বৃদ্ধি পায়। ইহসান শুধু ইবাদতে নয়; বরং মানুষের সঙ্গে আচরণ, দায়িত্ব পালন ও সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই উৎকর্ষের পরিচয় দেওয়ার শিক্ষা দেয়। যে সমাজে ইহসান প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে বিদ্বেষ কমে, ভ্রাতৃত্ব বাড়ে।
আত্মীয়–স্বজনের হক আদায় : পরিবার ও সমাজের শক্তিমূল
আয়াতে তৃতীয় নির্দেশ হলো আত্মীয়–স্বজনকে দান করা, যা অর্থনৈতিক সহায়তা থেকে শুরু করে খোঁজখবর নেওয়া, সহযোগিতা করা, পাশে দাঁড়ানো—সব কিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মীয়তার বন্ধন খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ঈমানের অংশ। পরিবার ভেঙে গেলে সমাজ ভেঙে যায়—এই বাস্তবতাই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। তাই ন্যায় ও ইহসানের পরপরই আত্মীয়দের হক আদায়ের নির্দেশ এসেছে—যা মানবসমাজকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়।
অশ্লীলতা ও অসঙ্গত কাজ থেকে বিরত থাকা : নৈতিকতার নিরাপত্তা প্রাচীর
এরপর আয়াতে তিনটি নিষেধাজ্ঞা এসেছে। প্রথমটি—
অশ্লীলতা (ফাহশা)।
অশ্লীলতা চরিত্র ধ্বংস করে, সামাজিক শান্তি ভঙ্গ করে এবং নৈতিকতার ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। এটি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সব দিক থেকেই ক্ষতিকর।
মুনকার : সব ধরনের অসঙ্গতি ও অন্যায় পরিহার
দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞা মুনকার, অর্থাৎ কোনো ধরনের অসঙ্গত, অকল্যাণকর, অনৈতিক ও অন্যায় কাজ। মুনকার মানুষের আত্মিক উন্নয়নে বাধা দেয় এবং সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে তা একসময় বৃহৎ সামাজিক সংকটে পরিণত হয়। তাই ইসলামের শিক্ষা হলো—অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং অন্যায় প্রতিরোধ করা।
বাগই : সীমালঙ্ঘন ও জুলুমের চরম রূপ
তৃতীয় নিষেধাজ্ঞা বাগই, যার অর্থ সীমা অতিক্রম করা, জুলুম করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। বাগই যে কোনো সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র—যেখানেই জুলুমের চর্চা জন্ম নেয়, সেখানেই শান্তি নষ্ট হয়। তাই ইসলাম জুলুমকারীর বিরোধিতা ও মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।
শেষ অংশ : আল্লাহর উপদেশই প্রকৃত সফলতার পথ
আয়াত শেষে আল্লাহ বলেন—
“তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যেন তোমরা স্মরণ রাখ।”
অর্থাৎ এই নির্দেশগুলো সাধারণ আদেশ নয়; বরং এমন উপদেশ, যা স্মরণে রাখলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরে শান্তি ও নৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
উপসংহার
সূরা আন–নাহল-এর এ আয়াতটি ইসলামের সার্বজনীন নৈতিক দর্শন। ন্যায়পরায়ণতা, ইহসান ও পারিবারিক দায়িত্ব সমাজকে গড়ে তোলে; আর অশ্লীলতা, অন্যায় ও জুলুম থেকে দূরে থাকা সমাজকে রক্ষা করে। যে মুসলমান এসব নির্দেশনা নিজের জীবনে ধারণ করবে, সে হবে নীতিবান, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু—যা প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়।