ফারজানা ফারাবি, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
রাষ্ট্রপরিচালনার অস্থায়ী দায়িত্বে থাকা সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদত্যাগের মাধ্যমে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক মহলে ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে ড. মোহাম্মদ ইউনুস আর দীর্ঘসময় দায়িত্বে থাকছেন না।
ড. ইউনুসকে ঘিরে সমালোচনা নতুন নয়। রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে একটি গোষ্ঠী তাকে নানা নামে অভিহিত করলেও দেশের বহু নাগরিকের কাছে তিনি ছিলেন সংকটকালে ‘একটি কার্যকর সমাধান’; এমন একজন ব্যক্তি যিনি উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশের সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে বড় ধরনের গৃহসহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা বাইরের শক্তির সম্ভাব্য প্রভাব—এসব থেকে দেশকে দূরে রাখতে তিনি কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
শপথ নেয়ার পর থেকেই ড. ইউনুস নিজ দায়িত্বকে অতিরিক্ত ক্ষমতা বিস্তার নয়, বরং সংকট নিরসনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার ম্যান্ডেট হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিলেন। প্রতিবারই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পন্ন করেই সরে দাঁড়াবেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কোনো আগ্রহ দেখাননি। বরং তিনি চেয়েছেন প্রশাসনিক স্থিতি ফিরিয়ে এনে নির্বাচন উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে।
তবে সমালোচকদের একটি অংশ সবসময়ই তাকে নিয়ে নানা অভিযোগ তুলেছে— তাকে ক্ষমতালোভী, অগণতান্ত্রিক অথবা আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বদাতাদের সঙ্গে তুলনা করে নানা মন্তব্য করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বক্তব্য—সব জায়গাতেই এমন অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি তারই জবাব দিচ্ছে। ক্ষমতায় থাকার অবকাশ বা রাজনৈতিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ড. ইউনুস ইচ্ছা করলেই আরও দুই-তিন বছর অবস্থান করতে পারতেন—এমন পর্যবেক্ষণ অনেক রাজনৈতিক গবেষকের। কারণ বিশেষ কোনো জনঅসন্তোষ, আন্দোলনের চাপ কিংবা চরম সংকট—এসব কিছুই এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। বরং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে তিনি নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখন নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এর মধ্যেই উপদেষ্টাদের পদত্যাগ স্পষ্ট সংকেত দিয়েছে যে সরকার কাঠামো দ্রুত পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে এবং নির্বাচনকালীন প্রশাসনে নতুন ব্যবস্থা আসছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় মহল মনে করছে, এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক সংকেত।

ড. ইউনুস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন সম্মানিত ব্যক্তি। বাংলাদেশের মধ্যেও বেশিরভাগ মানুষ তাকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরণে অবদানকারী হিসেবে দেখেন। সমালোচনার বাইরে গেলেও জাতীয় সংকটমুহূর্তে তার ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এজন্য তাকে নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তিনি দেশের সাধারণ নাগরিকদের কাছে সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন।
তবে একটি গোষ্ঠী শুরু থেকেই তার কার্যক্রম, উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ ছিল—উনি নির্বাচন এগিয়ে আনবেন না, ক্ষমতায় থাকার প্রবণতা দেখাবেন অথবা আগের অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে, এ অভিযোগের অনেকটাই ভিত্তিহীন।
দেশের চলমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, উপদেষ্টাদের পদত্যাগ এবং নির্বাচনমুখী প্রস্তুতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—ড. ইউনুসের দায়িত্ব শেষের দিকে এবং তিনি নিজ অবস্থান থেকে সরে গিয়ে একটি সাংবিধানিক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করছেন। দেশের সাধারণ মানুষও একটি স্থিতিশীল নির্বাচন চান, যা দীর্ঘ অস্থিরতার পর জাতীয় রাজনৈতিক ধারাকে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে।
পরিস্থিতির সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়—অল্প কিছু সমালোচনাকারী ছাড়া দেশের অধিকাংশ নাগরিক এখনো ড. ইউনুসকে সম্মান ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। দেশের সংকটকালীন সময়ে তার দায়িত্ব পালন এবং শান্তিপূর্ণ উত্তরণে কাজ করার মানসিকতা জনগণের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।