বিশেষ প্রতিনিধি : ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদে দুদকের মামলার আসামীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া গোপন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ নির্দেশনা দেয়া হয়।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনদের এখনো পরিচালনা পর্ষদে থাকার অভিযোগ উঠেছে। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে গোপন প্রতিবেদন তৈরি করে তাদের অপসারণের সুপারিশ করে মন্ত্রনালয়ে একটি প্রতিবেদন দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার আসামি, অর্থ আত্মসাতকারী ও তাদের আত্মীয়দের পর্ষদে থাকার কারণে কোম্পানির স্বচ্ছতা ও সুশাসন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের স্বার্থ ও আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে অগ্রগতি হচ্ছে না।
সম্প্রতি এই রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে জমা পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগটি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইডিআরএ নিয়োগ করা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং’ এবং বিএসইসির তদন্তে কোম্পানিটির প্রায় ২,৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মেলে। এ ঘটনায় দুদক চারটি মামলা করেছে। তবে মামলার আসামি ও তাদের স্বজনরা এখনও পর্ষদে থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, দফায় দফায় পর্ষদ পরিবর্তন হলেও আত্মসাতকারীরা নামে-বেনামে বা আত্মীয়দের মাধ্যমে পর্ষদে রয়েছেন। এতে অর্থ উদ্ধার না হওয়ায় গ্রাহকরা ভোগান্তিতে রয়েছেন এবং কোম্পানির স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়েছে।প্রতিবেদনে দুদকের মামলায় আসামিদের সম্পৃক্ততার নির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরা হয়—
মো. মোবারক হোসেন, বর্তমান পর্ষদের নিরপেক্ষ পরিচালক, মামলার ২নং আসামি আলহাজ মো. হেলাল মিয়ার ভাই। তিনি হেলাল মিয়ার মালিকানাধীন হযরত আমানত শাহ সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ওই প্রতিষ্ঠানে ফারইস্ট লাইফ ১৩৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ৬০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গোনে। বিনিয়োগের বিষয়ে কোনো পূর্ব ঘোষণা না দেওয়ায় এটি কর্পোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের লঙ্ঘন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাজনীন হোসেন, মামলার ৪নং আসামি ও বর্তমান পরিচালক। তিনি কোম্পানির যে জমি ক্রয়ের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ হয়, সেই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার স্বামী মোশারফ হোসেন পুস্তীও পর্ষদে প্রভাব বিস্তার করছেন, যা বীমা আইন ২০১০-এর লঙ্ঘন। ড. মোকাদ্দেস হোসেন, বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান। তার
দুই ভাই—ডা. মো. মনোয়ার হোসেন ও মোজাম্মেল হোসেন—দুদকের মামলার আসামি। ফলে তার পর্ষদে থাকা স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে।
শেখ মোহাম্মদ শোয়েব নাজির, নিরপেক্ষ পরিচালক পদে রয়েছেন। তিনি মামলার আসামি ডা. মো. মনোয়ার হোসেনের ভায়রা ভাই। এতে তার নিরপেক্ষ পরিচালক থাকা কর্পোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইনের লঙ্ঘন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিচালক ও আত্মীয়দের আর্থিক অনিয়মে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে, গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং কোম্পানির সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা ও আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে দুর্নীতিতে জড়িত আসামি ও তাদের আত্মীয়দের পরিচালনা পর্ষদ থেকে অপসারণ করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বোর্ড গঠন জরুরি। মামলায় তাদের নির্দোষ প্রমাণ হলে পরবর্তীতে পুনরায় পর্ষদে ফিরতে পারবেন।